শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে নারায়ণগঞ্জে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে নতুন বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। মানবিকতা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহমর্মিতার বার্তা নিয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচির চতুর্থ দিনে প্রায় ৩শ’ অসহায় মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেয় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, যুব ঐক্য পরিষদ এবং প্রভাত সমাজ কল্যাণ সংস্থা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টায় নারায়ণগঞ্জ মহানগরের নতুন পালপাড়াস্থ শ্রীশ্রী সত্যধাম রামঠাকুর মন্দির প্রাঙ্গণে এ বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি লিটন চন্দ্র পালের সভাপতিত্বে এবং জেলা যুব ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাত সমাজ কল্যাণ সংস্থার অর্থ পরিচালক ভজন দাসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি ননীগোপাল সাহা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ননীগোপাল সাহা বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সম্প্রীতি, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য প্রকাশ। উৎসবের প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষও সেই আনন্দের অংশীদার হতে পারেন। এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করবে। এ সময় তিনি সমাজের বিত্তবানসহ সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিরা উৎসবের আবহকে সার্বজনীন ও সম্প্রীতিময় করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রিচার্ড সৌরভ দেউরী বলেন, মানুষের সেবা করাই প্রকৃত মানবধর্ম। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে পারলেই সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। দুর্গাপূজার মতো আনন্দঘন সময়ে অসহায় মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া একটি মহৎ উদ্যোগ, যা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করে।
বাংলাদেশ স্কাউটস নারায়ণগঞ্জ জেলা রোভারের কমিশনার এস এম আরিফ মিহির বলেন, একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে হলে সামাজিক সংগঠনগুলোকে মানুষের কল্যাণে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু উৎসবকেন্দ্রিক নয়, সারা বছরই অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
জেলা যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও প্রভাত সমাজ কল্যাণ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনন্দ কুমার সেরাওগী সুমন বলেন, প্রভাত সমাজ কল্যাণ সংস্থা ও ঐক্য পরিষদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দ যেন কোনো মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন না থাকে, সেই ভাবনা থেকেই আমাদের এ উদ্যোগ। অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অরুন দেবনাথ বলেন, দুর্গাপূজা আমাদের আনন্দ, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির উৎসব। এ আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও সম্প্রীতিময় নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলতে চাই।
সভাপতির বক্তব্যে লিটন পাল বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য’—এই চেতনাকে ধারণ করেই আমাদের এ আয়োজন। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং উৎসবের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। সকলের সহযোগিতা ও আন্তরিকতায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব দীল মোহাম্মদ দীলু, নারায়ণগঞ্জ বৌদ্ধ বিহার ও জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা পঞ্চাননা ভিক্ষু, জেলা ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি হরি সাহা, ঐক্য পরিষদের নেতা ও সাংবাদিক রঞ্জিত মোদক, সহ-সভাপতি বিশ্বজিৎ সাহা, জেলা ঐক্য পরিষদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গোবিন্দ চন্দ্র দাস ও কৃষ্ণপদ মজুমদার এবং মহানগর যুব ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাতের পরিচালক রিপন কর্মকার।
এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগর ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব কুন্ডু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার সাহা পিংকু ও জীবন সাহা, প্রদীপ কুমার দে, হরিপদ পাল, সহ-সাধারণ সম্পাদক তপন চন্দ্র ধর, প্রচার সম্পাদক মানিক বিশ্বাস, বিপুল পোদ্দার, প্রকাশনা সম্পাদক সত্যরঞ্জন দেবনাথ, কিশোর দাস, উত্তম সরকার, বিপ্লব বাড়ৈ, গৌরাঙ্গ সাহা, বন্দর থানা যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি তুলশী ঘোষ, মিঠুন দত্ত বিল্লু, প্রণয় সিংহ, ঐক্য পরিষদের নেতা প্রবাস বিশ্বাসসহ জেলা ও মহানগর ঐক্য পরিষদ এবং যুব ঐক্য পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠান শেষে বক্তারা উৎসবের আনন্দ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও সম্প্রীতিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।