নারায়ণগঞ্জে চব্বিশের পাঁচই আগস্ট ঘটে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ঘটনা। থমথমে পরিস্থিতি থেকে শুরু করে নাটকীয় পরিবর্তন আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে দিনটি শেষ হয় এক অভাবনীয় বিজয় উল্লাসে।
সকাল থেকেই পুরো নারায়ণগঞ্জ শহরে এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি ঠেকাতে চাষাঢ়া ও তার আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অবস্থান নেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। রূপায়ন টাওয়ারে অয়ন ওসমানের কার্যালয়ে সকাল থেকেই তাদের সমাগম বাড়তে থাকে। সকাল দশটার দিকে শিক্ষার্থীরা চাষাঢ়ায় জমায়েত হতে শুরু করলে শুরু হয় পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ। চাষাঢ়া গোলচত্বর এলাকা ঘিরে তিন দিক থেকে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। সকাল ১১টার দিকে এই পরিস্থিতিতে যোগ দেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর একযোগে হামলা চালালে পুরো চাষাঢ়া এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই সহিংসতার মাঝে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান যুবদল নেতা স্বজন, এবং একই দিনে ঢাকা যাওয়ার পথে প্রাণ হারান সাবেক ছাত্রদল নেতা আমানত।
তবে দুপুরের পর থেকেই দৃশ্যপটে এক নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়। প্রবল জনরোষ ও ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধের মুখে দুপুরের আগেই চাষাঢ়া থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় পুলিশ। একই সাথে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে হামলাকারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরাও। দুপুর গড়াতেই যখন সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের খবর ছড়ায়, তখন আশপাশের সব এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ চাষাঢ়ার অভিমুখে রওনা হয়। বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে চাষাঢ়ায় অবস্থানরত অবশিষ্টাংশ নেতাকর্মীরাও শহর ছেড়ে গা ঢাকা দেয়।
সরকার পতনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই চাষাঢ়া ও তার আশপাশের এলাকা রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। জাতীয় পতাকা হাতে লাখো মানুষ নেমে আসে রাজপথে। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের পেশাজীবী মানুষ এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে বিজয়ের মিছিলে যোগ দেন। আনন্দ ও বিজয়ের উল্লাসে রাত পর্যন্ত মুখরিত থাকে পুরো নারায়ণগঞ্জ। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পর নারায়ণগঞ্জবাসী এমন গণজোয়ার আর অভূতপূর্ব বিজয় উল্লাস আর কখনো দেখেনি।