ত্রিশ হাজার টাকা সর্বনিম্ন মাসিক বেতন নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকার তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। সোমবার দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সোমবার দুপুর ১২টা থেকে ফতুল্লার শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল, জালকুড়ি ও ভুইঘরসহ বিভিন্ন এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকরা পৃথক পৃথক মিছিল নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় এসে সমবেত হন। পরে শ্রমিকরা একযোগে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ওভারপাসসহ দুই পাশে অবস্থান নিয়ে পুরোপুরি সড়ক বন্ধ করে দেন। দুপুর ২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাস্তায় কাঠ ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন, যা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যান ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটে। সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
বেলা আড়াইটার দিকে ভূঁইগড় এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। তবে ওই সময় হঠাৎ ভারী বৃষ্টি শুরু হলে শ্রমিকরা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রায় ৩০ মিনিট বৃষ্টির পর কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল শুরু হলেও পরে শ্রমিকরা শিবু মার্কেট এলাকায় আবার সংগঠিত হলে সড়ক পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধের কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় যান চলাচল স্তব্ধ থাকায় সাধারণ পথচারী ও দূরপাল্লার বাস যাত্রীরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন, আবার অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের মধ্যে আটকে থাকেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে আন্দোলনরত মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার শ্রমিক শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁর মাসিক বেতন মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তার মধ্যে বাসাভাড়াই দিতে হয় সাড়ে ৫ হাজার টাকা। মাসের বাজারে আরও ১০ হাজার টাকা লাগে এবং চিকিৎসাজনিত পরীক্ষার খরচই ৫ হাজার টাকা। বাকি খরচ কীভাবে মেটাবেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার জোর দাবি জানান।
একই সুরে আরেক শ্রমিক হাবিবুর রহমান তাঁর চার সদস্যের পরিবারের কষ্ট তুলে ধরে বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাঁরা কাজ করেই বাঁচতে চান, কোনো দান চান না। বাসাভাড়াসহ নিত্যপণ্যের দামের প্রেক্ষাপটে বেতন না বাড়ালে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবি জানান তিনি; অন্যথায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা সম্প্রতি ঢাকা ও গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে হতাহতের ঘটনারও তীব্র প্রতিবাদ জানান।
পরবর্তীতে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এবং জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের তৎপরতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন।
সংকট নিরসনে জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড গঠনের পর আন্দোলন হওয়া সমীচীন নয়। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভ হলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এখানে উস্কানি দিচ্ছে, যা বরদাশত করা হবে না। সাধারণ শ্রমিকের পাশে পুলিশ ও সরকার রয়েছে জানিয়ে তিনি স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় না পড়ার আহ্বান জানান।
একই সাথে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে অচিরেই একটি যৌক্তিক সমাধান করা হবে। সেই পর্যন্ত শ্রমিকদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবিগুলো সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।
ফতুল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম জানান, বিকেল সাড়ে ৪টায় পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তা থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।