‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ এ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র নদে প্রতিবছর চৈত্রের মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে স্নান করতে আসেন দেশ-বিদেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের লাখ লাখ পুণ্যার্থী।
জানা গেছে, বুধবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে লগ্ন শুরু হয়ে শেষ হবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায়। স্নানঘাট গুলোতে পূণ্যার্থীরা ফুল, বেলপাতা,ধান, দূর্বা,হরিতকি, ডাব, আম পাতা ইত্যাদি পিতৃকুলের উদ্দেশ্যে নদের জলে তর্পণ করেন। স্নানকে ঘিরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীর সুষ্ঠুভাবে স্নান সস্পাদনের লক্ষ্যে ২৪টি স্নান ঘাট, নারীদের জন্য কাপড় পরিবর্তন কক্ষ ও অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পুণ্যার্থীদের বিনামূল্যে খাবার, পানীয় জল সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবাসহ করেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এ উৎসবে অংশ নিতে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসবে। স্নান উৎসবে এবার কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে লোকজ মেলা।
পুণ্যার্থীদের জন্য নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসার ও র্যাব সদস্যসহ রয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। স্থাপন করা হয়েছে একাধিক ওয়াচ টাওয়ার। সড়ক ও নৌপথেও নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।

পূণ্যার্থীরা জানান, জগতের যাবতীয় সংকীর্ণতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা থেকে জীবন, দেশ জাতির শান্তি মঙ্গল কামনা ও পাপমুক্তির বাসনায় ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করেন তারা।
পুরোহিতরা জানান, পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামতো তীর্থে তীর্থে ঘুরতে থাকেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায় এখানে। এতে মনে করেন তার পাপ মোচন হয়েছে। খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। ক্রমাগত ভূমি শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। তাই এ স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। পুন্যার্থীরা বিভিন্ন ধরনের উপকরণ দিয়ে পুজা করে থাকেন।
লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব পরিদর্শন করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি আজাহরুল ইসলাম মান্নান, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি, জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ আরো অনেকে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, ১১০০ জন পুলিশ সদস্য ও ৬০০ জন আনসার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বী ও বিএনপির পক্ষ থেকেও স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। আশা করছেন পুণ্যার্থীরা তাদের স্নানোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে হবে।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি জানান, তীর্থস্থান জুড়ে পুণ্যার্থীদের জন্য নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসার ও র্যাব সদস্যসহ রয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। যানজট নিরসনে সড়কে পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ এবং নদীতে রয়েছে নৌ-পুলিশ। স্নানোৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।